ঈদুল আজহা ২০২৬

কোরবানি:
আল্লাহর নৈকট্য অর্জন

ত্যাগের মহিমায় উদযাপিত মহান ঈদ

কোরবানি হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নির্ধারিত পশু উৎসর্গ করা। এটি হজরত ইব্রাহিম (আ.) এবং হজরত ইসমাইল (আ.) এর আল্লাহর প্রতি অসীম আনুগত্য ও ত্যাগের স্মৃতিবিজড়িত এক মহান ইবাদত।

ফজিলত ও গুরুত্ব

কোরবানির মর্যাদা

আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম মাধ্যম

🕋

আল্লাহর নৈকট্য

কোরবানির রক্ত বা মাংস আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছায় না, পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া। কোরবানির মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করে।

🤲

ত্যাগের শিক্ষা

হজরত ইব্রাহিম (আ.) এর স্মৃতি স্মরণ করে মুসলিমরা শিখে যে আল্লাহর ভালোবাসায় সবচেয়ে প্রিয় বস্তুও ত্যাগ করতে হয়।

🤝

ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতি

কোরবানির মাংস গরিব-অসহায়দের মধ্যে বণ্টনের মাধ্যমে সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধ ও সম্প্রীতি বৃদ্ধি পায়।

📖

সুন্নাতে ইব্রাহিম

কোরবানি হজরত ইব্রাহিম (আ.) এর সুন্নাত। প্রত্যেক ধনী মুসলিমের জন্য এটি ওয়াজিব।

🌙

ঈদের আনন্দ

ঈদুল আজহার দিন কোরবানি করা মুসলিমদের জন্য মহান আল্লাহর এক অসীম নিয়ামত ও আনন্দের উপলক্ষ।

💝

দান-সদকাহ

কোরবানির মাধ্যমে গরিব ও অভাবী মানুষরা মাংস খেতে পান, যা দান-সদকাহর এক মহান রূপ।

ঐতিহ্য ও ইতিহাস

কোরবানির ইতিহাস

হজরত ইব্রাহিম ও ইসমাইল (আ.) এর ত্যাগের মহিমায় উদযাপিত

স্বপ্ন ও পরীক্ষা

হজরত ইব্রাহিম (আ.) স্বপ্নে দেখেন যে আল্লাহ তাঁকে তাঁর পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.) কে কোরবানি করতে আদেশ দিচ্ছেন। আল্লাহর নবীদের স্বপ্ন সত্য হয় এবং এটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহান পরীক্ষা।

ইব্রাহিম (আ.) তাঁর স্ত্রী হাজেরা ও পুত্র ইসমাইলকে নিয়ে মিনা পাহাড়ের দিকে রওনা হলেন। পথিমধ্যে শয়তান তাঁকে বারবার প্রলোভন দেখালো, কিন্তু ইব্রাহিম (আ.) পাথর মেরে শয়তানকে তাড়িয়ে দিলেন।

"যখন ইসমাইল বয়ঃপ্রাপ্ত হলো এবং তার সাথে ইব্রাহিমের সম্পর্ক পূর্ণ মাত্রায় প্রগাঢ় হলো, তখন ইব্রাহিম বললেন, 'হে আমার পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখছি যে আমি তোমাকে কোরবানি করছি। তুমি এখন ভাব দেখো কী বলো।' ইসমাইল বললেন, 'হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ দেওয়া হয়েছে তা করুন। আপনি ইনশাআল্লাহ আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন।'" — সূরা আস-সাফফাত, আয়াত ১০২-১০৩

অবশেষে যখন দুজনে আল্লাহর আদেশ মেনে নিলেন এবং ইব্রাহিম (আ.) ইসমাইলের উপর ছুরি চালালেন, তখন আল্লাহ তাঁকে ডেকে বললেনঃ

"হে ইব্রাহিম! তুমি তো স্বপ্ন সত্যে পরিণত করেছ। আমি তো এভাবেই সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত করি। এটা ছিল স্পষ্ট পরীক্ষা।"

আল্লাহ একটি মেষ শাবক কবুলর উপহার হিসেবে পাঠালেন এবং হজরত ইসমাইল (আ.) কে রক্ষা করলেন। সেই থেকে প্রতি বছর ঈদুল আজহায় মুসলিমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি করে আসছে।

নিয়মাবলি ও বিধান

কোরবানির নিয়মাবলি

শরীয়ত অনুযায়ী সঠিক পদ্ধতি ও বিধান

কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার শর্ত

সাহেবে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে কোরবানি ওয়াজিব। সাহেবে নিসাব হলো ৫২.৫ তোলা রুপা বা ৭.৫ তোলা সোনার সমমূল্যের সম্পদ যা এক বছর মালিকানাধীন থাকে।

কোরবানির সময়

ঈদুল আজহার দিন ঈদের নামাজের পর থেকে শুরু করে তিন দিন (১০, ১১, ১২ জিলহজ) কোরবানি করা যায়। ১৩ জিলহজের সূর্যাস্ত পর্যন্ত কোরবানির সময় থাকে।

কোরবানির পশু নির্বাচন

উট, গরু, মহিষ, ভেড়া ও ছাগল কোরবানি করা যায়। একটি উট বা গরু ৭ জন পর্যন্ত শরিক হয়ে কোরবানি করতে পারে। ভেড়া বা ছাগল একজনের পক্ষেই যথেষ্ট।

পশুর বয়স ও শারীরিক অবস্থা

উট কমপক্ষে ৫ বছরের, গরু ও মহিষ ২ বছরের, ছাগল ১ বছরের এবং ভেড়া ৬ মাসের হতে হবে। পশু সুস্থ ও রোগমুক্ত থাকতে হবে।

কোরবানির নিয়ত

আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিয়ত করে কোরবানি করতে হবে। নিয়ত ছাড়া কোরবানি শুধু মাংস খাওয়ার মতো, কোরবানি হবে না।

জবেহ করার পদ্ধতি

তীক্ষ্ণ অস্ত্র দিয়ে দ্রুত গলার নলি, শ্বাসনালী ও রগ কেটে জবেহ করতে হবে। পশুর নাম ও তাকবীর বলতে হবে।

কোরবানির পশু

কোরবানির যোগ্য পশু

শরীয়ত অনুমোদিত পশু ও তাদের শর্তাবলি

🐄

গরু/মহিষ

সবচেয়ে জনপ্রিয় কোরবানির পশু

বয়স: ন্যূনতম ২ বছর
শরিক: ৭ জন পর্যন্ত
🐏

ভেড়া

সাধারণ মানুষের পছন্দ

বয়স: ন্যূনতম ৬ মাস
শরিক: একজন মাত্র
🐐

ছাগল

সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী

বয়স: ন্যূনতম ১ বছর
শরিক: একজন মাত্র
🐪

উট

ঐতিহ্যবাহী কোরবানির পশু

বয়স: ন্যূনতম ৫ বছর
শরিক: ৭ জন পর্যন্ত
তারিখ ও সময়

কোরবানির দিনসমূহ

ঈদুল আজহার তিন দিন কোরবানি করা যায়

১০ জিলহজ

ঈদুল আজহার দিন। ঈদের নামাজের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কোরবানি করা যায়। এটি সর্বোত্তম দিন।

১১ জিলহজ

দ্বিতীয় দিন। সারাদিন কোরবানি করা যায়। যারা প্রথম দিন করতে পারেননি তারা এই দিন করতে পারেন।

১২ জিলহজ

তৃতীয় দিন। সারাদিন কোরবানি করা যায়। এটি কোরবানির শেষ দিন। ১৩ জিলহজের সূর্যাস্তের পর সময় শেষ।

বণ্টনের নিয়ম

কোরবানির মাংস বণ্টন

সুন্নাহ অনুযায়ী তিন ভাগে বণ্টন

কোরবানির মাংস তিন ভাগে ভাগ করা সুন্নাত
👨‍👩‍👧‍👦
নিজের জন্য
১/৩ অংশ

পরিবার-পরিজন ও নিজের জন্য রাখা যায়

🎁
আত্মীয়-স্বজন
১/৩ অংশ

আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের দেওয়া যায়

🤲
গরিব-অসহায়
১/৩ অংশ

গরিব ও অসহায় মানুষদের দান করা মুস্তাহাব

সাধারণ জিজ্ঞাসা

কোরবানি সম্পর্কে প্রশ্নাবলি

সাধারণ প্রশ্ন ও তাদের উত্তর

কোরবানি কি ওয়াজিব নাকি সুন্নাত?

+
অধিকাংশ বিশুদ্ধ মতে সাহেবে নিসাব হওয়া ব্যক্তির জন্য কোরবানি ওয়াজিব। হজরত আবু হানিফা (রহ.) এর মতে এটি ওয়াজিব, অন্যান্য ইমামদের মতে সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। তবে ধনী ব্যক্তির জন্য কোরবানি না করা মাকরূহ।

কোরবানির পশু ক্রয় করার সময় কি নিয়ত করা জরুরি?

+
পশু ক্রয়ের সময় নিয়ত করা জরুরি নয়। কোরবানির দিন জবেহ করার সময় নিয়ত করলেই হবে। তবে পশু ক্রয়ের সময় মনে মনে কোরবানির নিয়ত থাকলে উত্তম।

কোরবানির চামড়া কি করণীয়?

+
কোরবানির চামড়া ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করা যায় অথবা দান করা যায়। বিক্রি করে অর্জিত অর্থ দান করা যায়। চামড়া কোনো কসাইকে দেওয়া যাবে না কারণ সেটা তার মজুরি বলে গণ্য হবে।

বোনা বা দাঁত নেই এমন পশু দিয়ে কোরবানি করা যাবে?

+
জন্মগতভাবে বোনা নেই এমন পশু দিয়ে কোরবানি করা যাবে না। তবে দুর্ঘটনাজনিত কারণে দাঁত পড়ে গেলে বা ভেঙে গেলে কোরবানি জায়েজ থাকে, যদি খাওয়ার ক্ষমতা বজায় থাকে।

কোরবানির মাংস কি বিক্রি করা যায়?

+
কোরবানির মাংস বিক্রি করা জায়েজ নয়। এটি দান করা উচিত অথবা নিজেরা খাওয়া উচিত। তবে চামড়া বিক্রি করা যায় এবং সেই টাকা দান করা যায়।